Live Love Laugh...
04 Jul 2019

বুলিং এবং কিশোর মনের উপর এর প্রভাব

২০১৬ সালের জুলাই মাসে ১৪ বছর বয়সী একটি ছেলে স্কুল থেকে ফিরে এসে তার বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মারা যায়। তদন্ত করে জানা যায় যে তার সাথে একই গাড়িতে স্কুলে যাওয়া অন্য একটি ছেলে তাকে নানা ভাবে ভয় দেখাত, আপমান করত। অন্য একটি ঘটনায়, একটি মেট্রো শহরের নামকরা বেসরকারি স্কুলের ক্লাস ৯-এ পড়া এক ছাত্রের উপর শারীরিক এবং মানসিক আঘাত হানে তার সহপাঠীরা। ঘটনাটি জানাজানি হয় যখন সাধারণত শান্ত এবং মৃদু স্বভাবের ছেলেটি এতটাই মারমুখী হয়ে উঠে যে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়। বুলিং করা এবং এর কবলে পড়ার ঘটনা ভারতের সব প্রান্তে হামেশাই ঘটছে। অথচ এই নিয়ে বেশি সাড়াশব্দ শোনা যায় না।

Bullying
বুলিং বলতে কী বোঝায়?

বুলিং সত্যিকারের বা কল্পিত ক্ষমতার অসমতা যার প্রতিফলন ঘটে অবাঞ্ছিত আক্রমনাত্মক ব্যবহারের মাধ্যমে। এটি বারবার ঘটে, বা বারবার ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়, যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনে গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দেয়। তাই আচরণ থেকে পাওয়া সুত্র ধরে এই সমস্যা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি সনাক্ত করা জরুরী।

ফিজিক্যাল বুলিং -এর ঘটনার কথা বেশি জানা যায় যেহেতু এতে শারীরিক নির্যাতন-এর ভূমিকা রয়েছে। সাধারণভাবে বললে এর মানে হল শারীরিক জোর বা প্রভাব খাটিয়ে কাউকে ভয় দেখানো এবং তাকে দিয়ে জোর করে কিছু করানো। এর মধ্যে পড়ে যে কোনও ধরণের শারীরিক নির্যাতন, জোরজুলুম বা আক্রমনাত্মক নিপীড়ন, যা বারবার করা হয়। ব্যক্তির সম্বন্ধে অযাচিত কুরুচিকর মন্তব্য করা, তাকে উত্যক্ত করা, এমন নাম ধরে তাকে ডাকা যা অপমানজনক, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা, ভয় দেখানো এবং যৌন ইঙ্গিতে ভরা উক্তি করা-কে ভার্‌বাল বুলিং বলা হয়। সোশ্যাল বুলিং হল ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব রটানো, সামাজিকভাবে একা করে দেওয়া, ব্যক্তির চেহারা বা কোনও বিশিষ্ট আচরণকে ঘিরে মন্তব্য করা, ইত্যাদি। প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেটের প্রসার বাড়ার সাথে সাথে বুলিং-এর একটি নতুন ধরন দেখা দিয়েছে যাকে সাইবার বুলিং বলা হয়। এই ক্ষেত্রে নির্যাতন এবং আক্রমণের জন্য বৈদ্যুতিক মাধ্যম ব্যবহার করা হয়, এবং যার চূড়ান্ত পরিণতি আত্মহত্যা হতে পারে।

Physical Bullying

৮ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে অনলাইন বুলিং নিয়ে করা একটি সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছে যে ২৫টি দেশের মধ্যে ভারত তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ফিজিক্যাল বুলিং-এর ঘটনা দেশের স্কুলগুলিতে প্রতিনিয়ত ঘটছে। ৯ থেকে ১৩ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪২% এবং ১৩ থেকে ১৭ বয়সী ভারতীয় স্কুল-পড়ুয়াদের মধ্যে ৩৬% বুলিং এর কারণে নির্যাতিত। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে বাচ্চাদের মধ্যে পড়াশুনাকে নিয়ে অন্যকে বিদ্রূপ করার প্রবণতা রয়েছে। যারা কম নাম্বার পায় তাদের “ফেলু-মাস্টার” ধরণের নাম দেওয়া হয়।

বিভিন্ন ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বাচ্চাদের নাগালের মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার সুবাদে সাইবার বুলিং বা অনলাইন ট্রলিং-এর অনেক ঘটনার কথা ইদানীং জানা যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া একদিকে যেমন ব্যক্তিকে নিজের পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং সতীর্থদের সংস্পর্শে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে, তেমনই এর একটি অন্ধকার দিক ও রয়েছে। “টেকনোলজি এন্ড এডোলেসেন্ট মেন্টাল হেলথ” বইয়ে আলোচনা করা হয়েছে প্রযুক্তি এবং মানসিক স্বাস্থের সংযোগস্থলে কোন কোন ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ রয়েছে। বিশেষত বাচ্চা এবং কিশোরদের ক্ষেত্রে কারণ তারা সাইবার বুলিং-এর মধ্যমণি এবং এর কারণে তাদের মধ্যে অবসাদ, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যা বিষয়ে চিন্তা করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সারাক্ষণ নিজেদের সেরা প্রতিপন্ন করার চাপ এবং নিজের জীবনকে অন্যদের সাথে তুলনা করার ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের নির্যাতন এবং অনলাইন বুলিং-এর মুখোমুখি হতে হয়।

Cyber Bullying
বুলিং এবং বন্ধুত্ব

বন্ধুদের মধ্যে বুলিং, যাকে রিলেশন্যাল বুলিং-ও বলা হয়, চট করে ধরা যায়না। গুজব রটানো, সামাজিকভাবে বহিষ্কার করা এবং চেহারা বা বিশেষ পরিস্থিতিতে করা আচরণ নিয়ে কাউকে আপমানজনক কথা বলা এর আওতায় পড়ে। এটি বন্ধুত্বের আড়ালে হাসিঠাট্টার মাঝে পরোক্ষ ভাবে করা হয়, যার কারণে এটি আরও মারাত্মক হয়। বন্ধুদের দ্বারা করা এই ধরনের দাদাগিরি নির্যাতিত ব্যক্তির জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে উঠে কারণ এটা বিশ্বাস ভঙ্গ করার সমান।বিশ্বাসঘাতকতা বা বন্ধুদের হারানোর ভয়ে বাচ্চা বা কিশোর এই নিয়ে কথা বলতে না চাইতে পারে।

বাচ্চাদের উপর বুলিং-এর প্রভাব

বাচ্চাদের এবং কম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের পড়াশুনার গুণমানের উপর বুলিং-এর প্রভাব পড়ে কারণ তারা খোলা মনে স্কুলে বা কলেজে যেতে পারে না এবং সমর্থনের অভাবের ফলে ঘটনার কথা কাউকে জানাতে দ্বিধা বোধ করে। অনেকের উপর শারীরিক নিপীড়নের তুলনায় মানসিক আঘাতের কুপ্রভাব বেশি পড়ে।

ভারতের সাতটি রাজ্যে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৯০০০ পুরুষদের মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফোর রিসার্চ অন উইমেন এবং ইউএনএফপিএ দ্বারা করা এক সমীক্ষার পর জানানো হয়েছে যে ছোটবেলায় হিংসাত্মক ব্যবহার এবং বৈষম্যের সংস্পর্শে আসার ফলে ছেলেরা বুলিং-কে গ্রহণযোগ্য ব্যবহার হিসেবে আত্মস্থ করে নেয়। বুলিং-এর শিকার অনেকে নিজের মানসিক যন্ত্রণা ভুলে যাওয়ার জন্য নিজের উপর ইচ্ছে করে আঘাত হানে। অধিকাংশ ব্যক্তিরা নিজের কষ্টের কথা বাবা-মায়েদের দোষারোপের ভয়ে জানায় না এবং গোপনে অবসাদ, উদ্বেগ এবং বহিষ্কারের ফল ভোগ করে।

বুলিং বাচ্চাদের মধ্যে ভয় এবং নিজের প্রতি ঘৃণাকে জন্ম দেয় এবং এমন ঘটনা বারবার ঘটলে ভবিষ্যতে নিজেদের কমনীয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি মনে করতে তাদের অসুবিধা হয়। শুধু এই নয়। জীবনের শুরুতে এমন আঘাতের ফলে তারা পরবর্তী সময়ে ইতিবাচক বিকল্প এবং নিজের আনন্দকে সুরক্ষিত রাখার পন্থার চয়ন করতে পারে না।

অভিভাবক এবং শিক্ষকদের ভূমিকা

ব্যবহারে হঠাৎ পরিবর্তন, ঘুমোতে না পারা, খিদে না পাওয়া, মনের মতো কাজ করার ক্ষেত্রে উৎসাহের অভাব এবং পড়াশুনায় ক্রমাগত খারাপ ফল এমন কিছু লক্ষণ যার প্রতি বাবা-মায়ের খেয়াল রাখা দরকার। চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে এমন বাচ্চাদের মধ্যে হিংসাত্মক বা আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। বুলিং-এর কোনও ঘটনা যদি প্রাপ্তবয়স্কদের সামনে ঘটে তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগে তাদের উচিত তক্ষুনি বাধা দেওয়া। এমনটা করার কিছু উপায় নীচে জানানো হয়েছে।

  • • অভিভাবক এবং শিক্ষকদের যদি এমন ঘটনার কথা জানানো হয় তাহলে তা যথাযত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত এবং নির্যাতিত বাচ্চাটিকে নৈতিক এবং মানসিক সমর্থন জানানো উচিত।
  • • কমবয়সীরা চারিপাশে যা দেখে এবং অনুভব করে, তাই অনুকরণ করে। তাই বড়দের উচিত ইতবাচক ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া এবং বুলিং-এর কোনও ঘটনা চোখে পড়লে মধ্যস্ততা করা। সবসময় এক পাশে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের নিজেদের মীমাংসা করতে দিলে তাদের মনে হতে পারে যে এমন ব্যবহার ক্ষমার যোগ্য।
  • • যে এমন করছে বা যার সাথে এমন হচ্ছে (বুলি এবং নির্যাতিত) উভয়ের উপর কোনও তাকমা লাগাবেন না। বরং তাদের বুলিং-এর প্রভাবের বিষয়ে সচেতন করে তুলুন।
  • • ছোট বয়স থেকেই অনলাইন সাক্ষরতা এবং সুরক্ষার বিষয়ে বাচ্চাদের জানানো উচিত এবং অভিভাবক আর শিক্ষকদের সাইবার সুরক্ষাকে ঘিরে বাচ্চাদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলার বিষয়ে অগ্রগনি ভূমিকা পালন করা উচিত।
বুলিং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ

২০০৭ সালের রাঘবন কমিটির রিপোর্টে স্কুল এবং কলেজে রেগ্‌গিং আর বুলিং নিয়ন্ত্রিত করার বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই রিপোর্টে রেগ্‌গিং কে মানবাধিকারের উল্লঙ্ঘন বলা হয়েছে।

এই রিপোর্টের ভিত্তিতে সিবিএসসি (সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন) তাঁদের দ্বারা অনুমোদিত স্কুলে বুলিং রুখতে কমিটি গঠন করার আদেশ জারি করেছে। কমিটিগুলোর কাছে অধিকার রয়েছে অন্যদের বুলি করছে এমন ছাত্রছাত্রীদের সতর্ক করার, সাসপেন্ড করার এবং চূড়ান্ত ক্ষেত্রে স্কুল থেকে বার করে দেওয়ার।

কলেজে বুলিং রুখতে ২০০৯-এ ইউজিসি-র পক্ষ থেকে একটি অ্যান্টি-রেগ্‌গিং নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল। এই নির্দেশিকায় রেগ্‌গিং কে পরিভাষিত করা হয়েছে এবং কলেজগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে তারা যেন এমন ঘটনার সাথে মোকাবিলা করার জন্য কাউন্সেলর নিযুক্ত করে। প্রত্যেক কলেজে অ্যান্টি-রেগ্‌গিং স্কোয়াড গঠন করা এবং এমন ঘটনার খবর পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক।

বুলিং এবং সমগোত্রীয় নির্যাতনের ঘটনার রিপোর্ট ভারতীয় দন্ড বিধির বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী নথিভুক্ত করা যেতে পারে। এর মধ্যে কয়েকটি হল ধারা ৫০৬ (আপরাধমূলক ভীতিপ্রদর্শনের জন্য শাস্তি), ধারা ৩২৩ - ৩২৬ (আঘাত ও গুরুতর আঘাত এর শাস্তি), ধারা ৩০৪ (যদি বুলিং বা রেগ্‌গিং-এর কারণে নির্যাতিত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে), ধারা ৩০৬ (আত্মহত্যার প্ররোচনা)।

সাইবার বুলিং-এর জন্য ভারতে আলাদা করে কোনও আইন নেই। আইপিসি-র ধারা ৫০৬ এবং ৫০৭ অনুযায়ী সাইবার বুলিদের উপর মামলা চালানো যেতে পারে। মানহানির ঘটনার ক্ষেত্রে ধারা ৪৯৯ লাগানো যেতে পারে। ভারতীয় দন্ড বিধির ধারা ৩৫৪ এ আর ডি অনুযায়ী এখন বৈদ্যুতিক মাধ্যম ব্যবহার করে কোনও ব্যক্তিকে ধাওয়া করা, যৌন হেনস্থা করা, এবং অন্য যেকোনো ভাবে হেনস্থা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনও ব্যক্তির গোপনীয়তা ভঙ্গ করলে আইটি অ্যাক্টের ধারা ৬৬ ই লাগিয়ে শাস্তি নির্ধারিত করা যেতে পারে।

সব ধরনের নির্যাতনে শারীরিক চোট দেখতে পাওয়া যায়না। বুলিং-এর প্রকারও এমনই। একসাথে কাজ করা জরুরী সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য এবং সমাধান খোঁজার জন্য।

X